পানিসম্পদ রক্ষায় প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা

তরুণদের সম্পৃক্ত করে পানিসম্পদ রক্ষায় প্রযুক্তি নির্ভর সমাধানে বাংলাদেশ ওয়াটার মাল্টি-স্টেকহোল্ডারস পার্টনারশীপ (বিডব্লিউএমএসপি) এর সাত সদস্য মিলে চালু করেছে ওয়াটার ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ কম্পিটিশন-২০২১ (ডব্লিউআইসিসি)। এটুআই-এসপায়ার টু ইনোভেট, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসা, ২০৩০ ওয়াটার রিসোর্স গ্রুপ (২০৩০ ডব্লিউআরজি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) এবং ইউনিলিভার পিওরইট যৌথভাবে এই প্রতিযোগিতা চালু করেছে।

মঙ্গলবার অনলাইনে আয়োজিত ‘ওয়াটার ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ কম্পিটিশন-২০২১’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত হয়ে উক্ত প্রতিযোগিতার উদ্বোধন ঘোষণা করেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার।

পানিসম্পদের সুরক্ষায় মানুষের অভ্যাসগত পরিবর্তনে সাহায্য করতে মাসব্যাপী এই প্রতিযোগীতার মাধ্যমে প্রযুক্তি নির্ভর সমাধান খুঁজে বের করা হবে। পানির ব্যবহার কমিয়ে আনার পাশাপাশি শিল্পখাতে পানির অধিক ব্যবহার ও শোধনের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা বাড়াতে উদ্যোগটি ভূমিকা রাখবে। এছাড়া সুপেয় ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির জন্য অবকাঠামো তৈরিতে সরকারি বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও এটি সাহায্য করবে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ‘ডব্লিউআইসিসি-২০২১’ প্রতিযোগিতার থিম রাখা হয়েছে, #WaterSecurity #Innovation #Challenge। হ্যাকথন ধরনের এই চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগীতার লক্ষ্য পানির ব্যবহার নজরদারীর জন্য ‘হাউজহোল্ড ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট’ ও ‘ইন্ডাস্ট্রি ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট’ ব্যবহার করে যথাযথ টুলস ও প্লাটফর্ম খুঁজে বের করা, যেটি নাগরিকদের এবং শিল্পখাতকে পানি সাশ্রয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, ইনোভেশন শব্দটি সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আমাদের আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ২০৩০ ওয়াটার গ্রুপ গঠনসহ এমন আরো অনেক উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডেলটা প্ল্যান বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং আমরা আশা করি এর মাধ্যমে সুদূরপ্রসারী ফল বয়ে আনবে ও এই ইনোভেশনের যথাযথ প্রয়োগ আমরা করতে পারব। ডেলটা প্ল্যান ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে অভীষ্ট লক্ষ্য নিয়ে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা আমাদের পূর্বে ছিল না। পূর্বে নদীরক্ষা বা পানিসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে কাজ হচ্ছিল খুব অপরিকল্পিতভাবে। অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত মাটির গভীরের পানি উত্তোলন আবার যখন পানি ছেড়ে দিচ্ছি তখন সৃষ্টি করছি দূষণ, এই দুইভাবে আমরা পানিসম্পদ এর ক্ষতি করে যাচ্ছি।

তিনি আরো যুক্ত বলেন, এ প্রেক্ষিতে আমাদের কিছু বিষয়ে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। তার মধ্যে প্রথমে রয়েছে পানি যে একটি অমুল্য সম্পদ, তা সকলের উপলব্ধিতে নিয়ে আসা। বাংলাদেশের জনগণের জন্য বিষয়টি উপলব্ধি করা একটু কঠিন, তবে সাব-সাহারা দেশগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে যে পানি কতটা মূল্যবান।

তিনি বলেন, পানিসম্পদ রক্ষা ও এর সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সচেতন করা এবং তাদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে কাজে লাগাতে সবাইকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে এই রক্ষণাবেক্ষণে যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারা যেন থেমে না থাকে, বরং মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহ নানাভাবে আমাদের এই উদ্ভাবনী ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত থাকে। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পানির গুরুত্ব উপলব্ধির পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মরা এমন সব সেরা সমাধান বের করে আনবে, যাতে আমরা সুরক্ষিত পানির একটি পৃথিবীতে বাঁচতে পারি।

তরুণ উদ্ভাবকদের সম্ভাব্য সমাধানগুলো সামনে নিয়ে আসার পথ সুগম করার লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতায় আইডিয়া জমাদান শুরু হয়েছে ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলবে। উদ্ভাবকগণ চ্যালেঞ্জ ফান্ডের ওয়েবসাইট (http://challenge.gov.bd/) এর মাধ্যমে আইডিয়া জমা দিতে পারবেন। এই প্রতিযোগীতায় জমা পড়া প্রজেক্টের মূল্যায়ন ও স্ক্রিনিং চলবে ১৬ মার্চ থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত।

এরপর বাছাইকৃত ও উপযুক্ত সমাধানগুলোকে পরামর্শ দেয়ার জন্য একটি বুটক্যাম্পেরও আয়োজন করা হবে। বিচারক প্যানেল বাছাইকৃত সমাধানগুলো নির্বাচন করবেন। সবশেষে টেকনিক্যাল ইভাল্যুয়েশন প্যানেল (টিইপি) স্ক্রিন ও চূড়ান্ত নির্বাচনের মাধ্যমে সেরা উদ্ভাবক দল বাছাই করা হবে। তারপর আগামী ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবসে প্রতিযোগীতার গ্র্যান্ড ফিনালে আসরটি অনুষ্ঠিত হবে। এদিন প্রতিযোগীতায় চূড়ান্ত বিজয়ী উদ্ভাবক দলের নাম ঘোষণা করবেন বিচারকরা। এছাড়া পানি সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের পানির উৎসগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য ওয়েবিনারও অনুষ্ঠিত হবে।

পানিসম্পদ সুরক্ষার লক্ষ্যে গত ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর ওয়াটার ইনোভেশন ওয়ার্কস্ট্রিম (ডব্লিউআই-ডব্লিউএস) এর প্রথম বৈঠকে হ্যাকথন স্ট্যাইলের চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগীতা আয়োজনের বিষয়টি অনুমোদন সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে বিডব্লিউএমএসপি এর ন্যাশনাল স্টিয়ারিং বোর্ড (এনএসবি) ২২ জুলাই ২০১৯ সালে এক মেমোর মাধ্যমে ডব্লিউআইডব্লিউএস এর গঠন অনুমোদন করে। এই ওয়ার্কস্ট্রিমটির উদ্দেশ্য ছিলো- চিন্তাশীল, কৌশলগত বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেয়া এবং বিশুদ্ধ পানির বিষয়ে উদ্ভাবনী চিন্তার বাস্তবায়ন ও ডিজাইনের মাধ্যমে পানিসম্পদ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা। ওয়ার্কস্ট্রিমটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে জ্ঞানের সন্নিবেশন ও কারিগরি অংশীদারদের মাধ্যমে উদ্যোগগুলোর সহযোগীতায় এসডিজি-৬ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়। শিল্পখাত, কৃষি ও গৃহস্থালীর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে সুপেয় পানির অন্যতম প্রধান উৎস ‘ভূগর্ভস্থ পানি’ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ঢাকায় ৭৯ শতাংশ সরবারহকৃত পানি আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে এবং বাকি ২১ শতাংশ পানি পাওয়া যায় ভূপৃষ্ঠের জলাধারগুলো থেকে। ধারণা করা হয় গৃহস্থলী ও শিল্পখাতে ব্যবহৃত ৮০ শতাংশের বেশি অবিশুদ্ধ ও বর্জ্যপানি পুনরায় শোধন বা ব্যবহৃত না হয়েই ইকোসিস্টেমে ফিরে আসে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ‘২০৩০ ওয়াটার রিসোর্স গ্রুপ (২০৩০ ডব্লিউআরজি)’ এর গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যেই শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহে প্রায় ২১ শতাংশ ঘাটতি দেখা দেবে। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে বস্ত্র ও চামড়াখাতে প্রবৃদ্ধির কারণে পানির চাহিদা ২৫০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উপরন্তু, ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতা হ্রাস ও নদীর পানির শুদ্ধতার মানও কমে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উপনিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ-এর বাস্তবায়নাধীন ও ইউএনডিপি এর সহায়তায় পরিচালিত এটুআই-এসপায়ার টু ইনোভেট প্রোগ্রাম বিভিন্ন সময় নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে চ্যালেঞ্জ ফান্ড প্রদান করে আসছে। এর মাধ্যমে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে এটুআই। বাংলাদেশ সরকার দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে আপামর জনশক্তি, বিশেষত যুব জনগোষ্ঠীর অপরিসীম উদ্যম এবং উদ্ভাবনী ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তর-এর মহাপরিচালক ড. এ, কে, এম, রফিক আহাম্মদ; ঢাকা ওয়াসা-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান; এটুআই-এর প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. আব্দুল মান্নান, পিএএ; বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি-এর সভাপতি জনাব মো. শাহিদ-উল-মুনীর; বেসিস-এর সভাপতি জনাব সৈয়দ আলমাস কবীর; ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড-এর কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স এর প্রধান জনাব শামীমা আখতার; ২০৩০ ওয়াটার রিসোর্সেস গ্রুপ-এর রিজিওনাল কোঅর্ডিনেটর জনাব সাইফ তানজিম কাইয়ুম’সহ এটুআই, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসা, বিসিএস, বেসিস, ২০৩০ ডব্লিউআরজি এবং ইউনিলিভার পিওরইট এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ও গণমাধ্যম কর্মীগণ।